Logo
প্রচ্ছদ কাহিনি
সমসময়
আলাপচারিতা
বিশ্লেষন
অনুসন্ধান
প্রতিবেদন
মিডিয়াওয়াচ
প্রবাস জীবন
অন্যভূবন
ধারাবাহিক
আত্মজীবনী
অন্যদেশ
রঙ্গের দুনিয়া
খেলা খেলা নয়
দুই পা ফেলিয়া
আয়োজন
 
  অন্যদেশ

বিদায় শাভেজ!

মৃত্যুতেও অপরাজেয় তুমি

মানবতার লড়াইয়ে যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, কে বলে তিনি মৃত? তিনি প্রয়াত অথচ ভীষণভাবেই বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই সংগ্রামের ময়দানে। তার প্রভাব বিস্তৃত ভেনেজুয়েলা থেকে লাতিন আমেরিকায়। টানা দুই বছরের প্রতিটি অণুমুহূর্ত ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে অবশেষে হার মানলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ। মঙ্গলবার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের অবিসংবাদী এই নেতা। ভেনেজুয়েলার সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিট নাগাদ কারাকাসের কার্লোস আরভেলো সামরিক হাসপাতালে স্তব্ধ হয়ে গেল তার হূৎস্পন্দন। পরিসমাপ্তি ঘটল শাভেজের বর্ণময় জীবন চলার পথ। জাতীয় টিভি চ্যানেলে আবেগরুদ্ধ গলায় শাভেজের মৃত্যুসংবাদ প্রথম ঘোষণা করেন দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। প্রিয় নেতার মৃত্যুর কথা জানানোর সময় কান্নাকে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু পারলেন না। গাল বেয়ে নেমে আসা অঝোরে চোখের জলে মাদুরো বলছিলেন, আজ আমাদের শোকের দিন। মানুষের শোকের দিন। সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন আমাদের অভিভাবক। এখন আমাদের শক্ত হতে হবে। আগামী দিনে ভেনেজুয়েলা শাভেজের দেখানো রাস্তাতেই হাঁটবে বলে ঘোষণা করেছেন মাদুরো। মাদুরোর ঘোষণা শেষ হতেই তার পাশে থাকা দেশের শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তারা সমস্বরে বলে ওঠেন, 'শাভেজ দীর্ঘজীবী হোক'। দুই বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিলেন তিনি। মোট চারবার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তবু অসীম জীবনীশক্তি নিয়েই লড়ে গেছেন মৃত্যুর সঙ্গে। লড়েছেন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। মারণ রোগের যন্ত্রণা নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েছেন। প্রচারে বেরিয়ে চোষে ফেলেছিলেন গোটা দেশ। নির্বাচনে তার কাছে ধরাশায়ী হয়েছিল আমেরিকার মদদপুষ্ট জাঁদরেল প্রার্থীও। কিন্তু ৪ মাসের মধ্যেই তিনি পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন মৃত্যুর কাছে। মৃত্যুই ইতি টেনে দিল প্রেসিডেন্ট পদে তার টানা ১৪ বছরের শাসনকালকে। শাভেজের মৃতদেহ দেশের মিলিটারি আকাদেমিতে শায়িত থাকবে। ৮ মার্চ, শুক্রবার তার শেষকৃত্য হবে বলে জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট হয়ে তেলশিল্পের জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কারসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল দেশে সামাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে কিউবা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোকে নিয়ে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন 'আলবা'। শাভেজের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই কারাকাসসহ দেশের সর্বত্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, সরকারি ভবন বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার শোকস্তব্ধ ভেনেজুয়েলায় অর্ধনমিত রাখা হয়েছে জাতীয় পতাকা। ৭ দিন ধরে জাতীয় শোক চলবে বলেও ঘোষণা করেছেন মাদুরো। দুই মাস হাভানায় চিকিৎসার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশ ফিরে আসেন শাভেজ। কোমরের কাছে পেলভিক জোনে ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। ২০১১ সালে ক্যান্সার ধরার পর চারবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তার। অস্ত্রোপাচারের জন্য গত বছরের ১০ ডিসেম্বর কিউবায় উড়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিউবায় চিকিৎসকদের চেষ্টায় কিছুটা সুস্থও হচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু এর মধ্যেই ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল রক্তপাতে তার শারীরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। চিকিৎসা চলাকালীন হাভানায় শাভেজের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেন ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রো। এ ছাড়া ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরিয়া, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসও হাভানায় গিয়ে শাভাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত বছরের অক্টোবরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ছয় বছরের জন্য ক্ষমতায় বসেন ৫৮ বছরের শাভেজ। কিন্তু শারীরিক কারণে শপথও নিতে পারেননি। চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়ে কিউবায় যেতে বাধ্য হন। সুপ্রিম কোর্টও অনির্দিষ্টকালের জন্য তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অনুমোদন করে। কিন্তু শাভেজের মৃত্যুতে ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। দেশের সংবিধান অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যেই নির্বাচিত হতে হবে প্রেসিডেন্টকে। এদিকে, দেশের বিদেশমন্ত্রী এলিয়াস জাউয়া এদিন ঘোষণা করেছেন, শাভেজের নিজের হাতে তৈরি মাদুরোই দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এ রকমই নির্দেশ দিয়ে গেছেন আমদের কমানদান্তে শাভেজ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিয়েগো মোলেরো শীর্ষস্থানীয় সেনাকর্তাদের নিয়ে এদিন জানিয়েছেন, দেশের সংবিধান ও শাভেজের স্বপ্নকে রক্ষা করতে তৈরি সেনারা। মার্কিন কূটনীতিক ডেভিড ডেল মোন্যাকোকে ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওই কূটনীতিক দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন মাদুরো। প্রিয় নেতার মৃত্যুর খবর পেয়েই রাস্তায় নেমে আসে গোটা ভেনেজুয়েলা। শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তরুণ, তরুণী থেকে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা। রাস্তায় রাস্তায় শাভেজের ছবি, পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন প্রত্যেকে। শোককে চেপে রেখেই তারা স্লোগানে অভিবাদন জানাচ্ছেন 'শাভেজ বেঁচে আছেন!', 'আমরাই এক একজন শাভেজ', 'লড়াই চলবেই।' শাভেজের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে গোটা বিশ্বই। শোক বার্তা পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা। ভারতের বিদেশমন্ত্রক, রাষ্ট্র সংঘের নিরাপত্তা পরিষদও শোকবার্তা পাঠিয়েছে। শোকবার্তা এসেছে ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। সংগ্রামের সাথি, বন্ধু হারানোর যন্ত্রণা লাতিন আমেরিকাজুড়ে। তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে কিউবা। শাভেজের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। ভেনেজুয়েলার গরিব মানুষের উন্নতির পেছনে শাভেজ বিশেষ অবদান রেখে গেছেন বলে শোকবার্তায় উল্লেখ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে কলম্বিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ায় শাভেজের ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বান কি মুন। শাভেজনামা 'আমার মনে হচ্ছিল যেন দুজন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে আমি কথা বলছি। একজন, যিনি নিজের মতো করে দেখতে ভালোবাসেন। যাকে মানুষ দেশকে বাঁচানোর সুযোগ দিয়েছেন। অন্যজন, যিনি স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা একজন মানুষ, আর পাঁচজনের মতো যার নামও একদিন চলে আসবে ইতিহাসের পাতায়- বলেছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। এক দশক আগে 'এনিগমা অব দি টু শাভেজ' শিরোনামে লেখা নিবন্ধে। সত্যিই তিনি 'নিজের মতো করে দেখতে ভালোবাসতেন।' দুনিয়া বদলের 'স্বপ্নে বিভোর থাকতেন'। সেপ্টেম্বর, ২০০৬। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। জর্জ বুশ ভাষণ দেওয়ার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা পরে প্রবল পরাক্রান্ত ইয়াঙ্কি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে 'শয়তান' বলার হিম্মত দেখান তিনি। বলেন, 'গতকাল, যুদ্ধবাজ শয়তানটা এখানে এসেছিল। এখানে, ঠিক এখানেই। শয়তানটার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।' তিনি হুগো রাফায়েল শাভেজ ফ্রায়াস। ফিদেলের মতো তিনি কমিউনিস্ট নন, কিংবা নন লুলার মতো পোড় খাওয়া ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কমান্ডার। সামরিক বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম এ। ২৮ জুলাই, ১৯৫৪। গুয়াতেমালায় সিআইএর মদদে আরবেনজ সরকারের অপসারণের ক'দিন বাদেই বারিনাস প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম সাবানেতায় শাভেজের জন্ম। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন স্কুলশিক্ষক। সাত সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বারিনাস শহরের হাইস্কুলের পাঠ শেষে ভর্তি হন কারাকাসের মিলিটারি আকাদেমিতে। সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩। উনিশের তরুণ শাভেজ যখন সামরিক আকাদেমির ক্যাডেট, তখন দুনিয়া চিলিতে দেখে আরেক ৯/১১। সিআইএর মদদে সালভাদোর আলেন্দে সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান। এই সময় থেকেই শাভেজের মধ্যে শুরু হয় এক নবচেতনায় উত্তরণ। শাভেজের কথায়, 'রাত ৯টার মধ্যে ঘুমোতে যাবার নিয়ম ছিল। আমরা কয়েকজন সৈনিক তখন সেই নিয়ম অমান্য করি। কারণ রেডিও হাভানায় ফিদেলের বক্তৃতা শুনব বলে। একটি বক্তৃতায় চিলির অভ্যুত্থান ও আলেন্দের শহীদ হওয়া প্রসঙ্গে ফিদেল বলেন, যদি প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের একটি করে বন্দুক থাকতো, তাহলে চিলির ফ্যাসিস্ত অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যেত।' 'ফিদেলের এই বক্তৃতা আমাদের দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে তোলে।' সৈনিক থেকে বিপ্লবী শাভেজ। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাস্ত্রোর সহযোদ্ধা। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক। যার জাতীয়তাবাদ মোটেই ছোট্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের তাবৎ শোষিত মানুষকে যিনি সাগ্রহে টেনে নিয়েছেন বুকে। নিজেকে পরিচয় দিতেন 'ফিদেলিস্তা' বলে। ফিদেলিস্তা মানে ফিদেলপন্থী। ফিদেলের পথের পথিক। চিন্তা-চর্চায় কাস্ত্রোর পথের অনুসারী। শাভেজের প্রথম পছন্দ অবশ্যই ফিদেল। দ্বিতীয় বেসবল খেলা। প্রকাশ্যেও বলতেনও সে কথা। 'ফিদেল আমার বাবার মতো, আমার সবকিছু।' ওয়াশিংটনের চোখ রাঙানিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে কিউবাকে সস্তায় তেল সরবরাহ করেছেন। তার জীবনাবসানের পর কিউবার সরকারি টেলিভিশনে এক বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ থেকে তাই বলা হয়েছে, 'যোগ্য সন্তানের মতো বরাবর ফিদেলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শাভেজ।' প্রায়ই বলতেন তিনটি কথা: হিস্টোরিক আওয়ার। স্ট্র্যাটেজিক মিনিট। ট্যাকটিক্যাল সেকেন্ড। যুদ্ধজয়ের নিখুঁত সূত্রায়ণ ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯। কারাকাসে জনরোষ। এল কারাকাজো। আইএমএফের দাওয়াই: ব্যয়সঙ্কোচ। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারীকরণ, পরিবহনের ভাড়া ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে উত্তাল শহর। গুলির বন্যায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল কারাকাস। রিচার্ড গটের ভাষায়, 'ভেনেজুয়েলায় পুরোনো জমানার শেষের সূচনা।' রাস্তায় সেই দৃশ্য দেখে শাভেজের মনে হয়েছিল এই সেই মহার্ঘ মুহূর্ত: হিস্টোরিক আওয়ার। স্ট্র্যাটেজিক মিনিট। টেকটিক্যাল সেকেন্ড। সামরিক অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেন শাভেজ। ব্যর্থ হন। বাধ্য হন আত্মসমর্পণে। তবে একটিই শর্তে: টেলিভিশনে বলতে দিতে হবে। ভেনেজুয়েলার মানুষ বলেন, শাভেজের ওই বক্তৃতাই আসলে ছিল তার প্রথম নির্বাচনী বক্তৃতা। তারপর জেল। এবং জেল থেকে বেরিয়ে সটান হাভানায়। ফিদেলের কাছে। ফিদেল তাকে মানুষের সঙ্গে থাকতে বলেন। ফিরে এসে সেই কাজই শুরু করেন। ১৯৯৮। নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত শাভেজ। শাভেজের কাছে তাই ফিদেল 'আমার কমরেড, নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি নির্মাণের মাস্টার।' এপ্রিল, ২০০২। শাভেজকে হটাতে সিআইএর মদদে সেনা অভ্যুত্থান। সেনা অভ্যুত্থান দেখতে অভ্যস্ত এই প্রথম লাতিন আমেরিকা দেখে পাল্টা গণ-অভ্যুত্থান। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের লাখো মানুষ কারাকাসে জমায়েতে হয়ে পাল্টা অভ্যুত্থান করে ফিরিয়ে আনেন প্রিয়তম রাষ্ট্রপতি শাভেজকে। ষড়যন্ত্রের এটাই শুরু কিংবা শেষ নয়। ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে মার্কিন মদদে বিরোধীরা টানা দুই মাস ধর্মঘট করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশের অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলা। যাতে শাভেজকে অনায়াসে অপসারণ করা যায়। কিন্তু দেশের মানুষ দৃঢ়তার সঙ্গে শাভেজের পাশে দাঁড়ান। মাঝখান থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে গুনতে হয় এক হাজার কোটি ডলার লোকসানের বোঝা। এতেও সরানো না গেলে বিরোধীরা গণভোটের দাবি করেন। সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৭ সাল পর্যন্ত শাভেজের থাকার কথা। কিন্তু বিরোধীরা মানতে নারাজ। সাহসী শাভেজ গণভোটে যান। ১৫ আগস্ট, ২০০৩। এবং এবারেও বিপুল ভোটে জয়ী হন। এরপর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে যাওয়ার পথে শাভেজের প্লেনকে উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে সিআইএ। ভেনেজুয়েলার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ওই চক্রান্ত জেনে ফেলে। একেবারে শেষ মুহূর্তে শাভেজ তার সফর বাতিল করেন। ওয়াশিংটনের নাকের ডগায় বসে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লাতিন আমেরিকার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। শেষ দিন পর্যন্ত ঐক্য নির্মাণে স্থিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর টানা চৌদ্দবার (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে) নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছেন শাভেজ। জিতেছেন প্রায় সব কটিতেই (একমাত্র সংবিধান সংস্কার নিয়ে ২ ডিসেম্বর, ২০০৭ গণভোটে ০.৩১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন)। জিতেছিলেন শেষবারেও। পুঁজিবাদের মধ্যে থেকেও বিকল্প নির্মাণের পথে হেঁটেছেন তিনি। ভেনেজুয়েলায় এই পরিবর্তনের অভিমুখ- বাম পন্থার দিকে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। তার সরকার নিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জনমুখী কর্মসূচি। তার ভাষায় 'একুশ শতকের সমাজতন্ত্র'। গত বছরের জুনে রপলভিক অ্যাবসেসের সমস্যায় পড়েন শাভেজ। জুনের ১০ তারিখ হাভানায় তার অস্ত্রোপচার হয়। ৫৮ বছর বয়সী শাভেজের শরীরে চারবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ডিসেম্বরের ১১ তারিখ হাভানায় ক্যান্সারের চতুর্থ অস্ত্রোপচারের পরেই ফুসফুস সংক্রমণে আক্রান্ত হন। কিউবায় ৭০ দিন চিকিৎসার পর ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসেন। তার আগের রাতে সন্তানসম শাভেজকে বিদায় জানিয়ে অসম্ভব প্রত্যয় নিয়ে কিউবা বিপ্লবের নায়ক ফিদেল লেখেন, 'সমাজতান্ত্রিক শিবির যখন ধসে পড়ল, যখন ভেঙে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন, সাম্রাজ্যবাদ তখন অবরোধের ধারালো ছুরি মেরে কিউবার বিপ্লবকে রক্তাক্ত করতে চেয়েছিল। বিভক্ত আমেরিকা মহাদেশের একটি ছোট রাষ্ট্র হয়েও ভেনেজুয়েলা তা প্রতিহত করেছিল।' 'গভীর উষ্ণ আলিঙ্গন' জানিয়ে শাভেজের প্রতি ফিদেলের ছিল 'সর্বদা বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলার' প্রত্যয়ী বার্তা। সেই মহার্ঘ্য বার্তা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে শাভিস্তারা।

  চলতি সংখ্যা  
   
  সর্বশেষ সংবাদ  
›› ডা. ইমরান এইচ সরকার এঙ্ক্লুসিভ 'মুক্তিযুদ্ধ কারও ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়' 'খালেদা জিয়ার কাছে আশাটা বেশি ছিল, যেহেতু তিনি একাত্তরের বীরাঙ্গনা' 'স্বাচিপের নেতা তো নই-ই, সদস্যও না'
›› লাগাতার হরতাল, প্রণবের ঢাকা সফর ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাহীনতা
›› বিদায় শাভেজ! মৃত্যুতেও অপরাজেয় তুমি
›› আবাসন খাতে জামায়াত নেটওয়ার
›› ৫৬ বছর পর প্রণব বাবু এলেন শ্বশুরবাড়ি ছিলেন ৩৫ মিনিট
›› নারীর উন্নয়নের নামে এনজিওর প্রজেক্টনির্ভর প্রেম
   
 
 
পুরনো সংখ্যা