a
Logo
প্রচ্ছদ কাহিনী
সমসময়
আলাপচারিতা
বিশ্লেষন
অনুসন্ধান
প্রতিবেদন
মিডিয়াওয়াচ
প্রবাস জীবন
অন্যভূবন
ধারাবাহিক
আত্মজীবনী
অন্যদেশ
রঙ্গের দুনিয়া
খেলা খেলা নয়
দুই পা ফেলিয়া
আয়োজন
 
  মন্তব্য কলাম
 

নারীর উন্নয়নের নামে এনজিওর প্রজেক্টনির্ভর প্রেম

শরীফা বুলবুল

'নারীবাদ' আর 'মানবতাবাদ' এক কথা নয়- কথাটি আমাদের খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বলে গেছেন ড. হুমায়ুন আজাদ। তার মতে, নারীবাদ মানবতাবাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা চিন্তা। সেটা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক। সমাজবিপ্লব, গণতান্ত্রিক পরিবেশই নারী মুক্তির পূর্বশর্ত। কিন্তু এর মধ্যে কোথায় যেন বিস্তর ফারাক। এর রন্ধ্র ফাঁক আর ফাঁকিতে ভরা। সমাজব্যবস্থার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নারী অধিকতর সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র। এর বেশি কিছু নয় যেন। নারীবাদী গবেষকরা দেখিয়েছেন, সমাজতান্ত্রিক বা কল্যাণমুখী কোনো রাষ্ট্রেই নারীর সার্বিক মুক্তি ঘটেনি। অবশ্য যতক্ষণ না নারীর সমস্যার ওপর স্বতন্ত্র ফোকাস ফেলা না হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত নারীর সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত হবেও না। কারণ বাংলাদেশ হচ্ছে পুঁজিবাদের এক উর্বর ভূমি। এখানে পুঁজিবাদের স্থূল, বর্বর উৎপীড়ন ও বন্দিদশায় নারী আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। তার ওপর আছে ধর্মের বিধিনিষেধসহ শোষণের বিস্তর প্রক্রিয়া। এই পুঁজি মুনাফার বিস্তর চাপে নারী এক ভয়াবহ লোলুপতার শিকার। অবশ্য চিহ্নিত হবারও কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নারীর জন্য এখন মোড়ে মোড়ে বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো নারী মুক্তির জন্য প্রজেক্টনির্ভর দোকান খুলে বসেছে। বিশেষ বিশেষ দিবসে তারা শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হন। এই সুযোগে ইসলামি মৌলবাদীরাও নারী উন্নয়নের নামে খুলে বসেছে এনজিওর দোকান। এতে তারা কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। অথচ স্বাধীনতার এই ৪২ বছরে দিকে দিকে যতগুলো এনজিওর জন্ম হয়েছে, তাতে সারা দেশের নারীরা উন্নয়নের জোয়ারে ভাসার কথা। কিন্তু না, দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, কেউ নারীর বন্ধু নয়। বন্ধুর মুখোশে শত্রুতা করে। মিষ্টি কথায় ধাপ্পা দেন। দরিদ্র নারী দরিদ্রই রয়ে গেছেন। নারীর জন্য তাদের প্রতিবাদ খুবই ইস্যুভিত্তিক, মোটেই কোনো পূর্বাপর সমন্বিত পরিকল্পিত কোনো কাঠামো নেই এসব প্রতিবাদের। নারীর প্রতি প্রজেক্টনির্ভর প্রেম বটে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও ওই প্রজেক্টনির্ভর নারী উন্নয়নকর্মীদের দেখা যাবে, আমাদের মূলধারার নারী আন্দোলনের কর্মীদের পাশে! তারাও শহীদ মিনারে বিশাল ব্যানারে ভাড়া করা নারীদের নিয়ে হাজির হবেন। কদিন আগে এক এনজিওর প্রোগ্রামে গিয়েছি রিপোর্ট করতে। সেখানে দেখলাম, বেশ কয়েকটি কন্যাশিশুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের হাতে প্রশ্ন লিখে ছোট ছোট চিরকুট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবকিছু সাজানো। বারবার ওদের শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছিল এই প্রশ্নটা তুমি করো। আমি ইচ্ছে করে বারবার তাদের ওই চেহারা পড়ার চেষ্টা করছিলাম। যাতে তারা লজ্জা পায়। বিব্রত হয়। তবে দেখেছি মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিতে। যেন আমাকে দেখছে না। এটা হচ্ছে, প্রজেক্টনির্ভর প্রেমের ছোট্ট একটি নমুনামাত্র। প্রজেক্ট শেষ হয়ে গেলে প্রেমও শেষ! খোঁজ নিলেই জানা যাবে, শান্তিতে নোবেল জয়ের পেছনের সেই জোবরা গ্রামের সুফিয়া সুফিয়াই রয়ে গেছেন। আবার প্রচারও করা হয়, ওই সব মডেল নাকি আমেরিকানও ফলো করেন বেশ! আমেরিকানরা বাঙালি সুফিয়ার মতো হবে? হাঁস-মুরগি গরু ছাগল লালন পালন করে স্বাবলম্বী হবেন! নিজেদের ভণ্ডামি ঢাকতে এ-ও যেন আরেক সূক্ষ্ণতম ধাপ্পা! উন্নয়নের জোয়ারে ভাসেন কেবল এর কর্তারা। নারীর উন্নয়নের কথা বলে তারাই বসে থাকেন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত উজ্জ্বল কক্ষে। প্রোজ্জ্বল আসনে। এতো ঠগ আর ধাউরের মধ্যে নারীপ্রশ্নের মতো স্পর্শকাতর বিষয় টিকবে কী করে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ব্যবসায় এখন যৌনকর্মী থেকে শুরু করে কেউ পিছিয়ে নেই। সবাই এনজিওর মালিক। যদি এনজিওর দোকান খুলেই বসবে, তাহলে যৌনকর্ম না করলেই তো পারেন? স্বস্তি নিয়ে ভালো করেই বাঁচুন? সেখানে আমার নারীর উন্নয়ন কোথায়? আমরা তো ওই বাংলাদেশ চাইনি! বিপরীত অথচ সমান্তরাল অন্য একটি ধারাও ক্ষীণভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আফরেই (১৯৯৯) জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইসলামিক অর্থায়ন, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ও সৌদি আরবের ধনী ব্যক্তিদের অনুদান এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি এনজিওর মাধ্যমে বিলি করা হচ্ছে, স্বল্প আয়ের নারীদের আকৃষ্ট করছে। বেশ কিছু তরুণও এই অর্থায়নের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন এক অলীক আশা থেকে যে এই অর্থনীতি হয়তো আইএমএফ বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষমতাকাঠামো থেকে তাদের মুক্ত করবে এবং ব্যাপক হারে বেকারত্ব, ছদ্ম-বেকারত্ব থেকে তাদের মুক্তি দেবে। নারীবাদের নয়া পুরুষতান্ত্রিক মডেলের অন্তর্গত নারীরা ভাবছেন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করবে এই অর্থে, যা ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দেবে এবং এভাবেই পারিবারিক জীবনে একধরনের নিশ্চয়তা ফিরে আসবে, যার চুইয়ে পড়া প্রভাব তার জীবনেও আসবে। অবশ্য নারীবাদ, নারীমুক্তি আন্দোলন আবার মৌলবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, বাজারকে সেভাবে নয়। তার ওপর বিশ্বায়নের নামে নারীর দেহ সৌন্দর্যকে ঘিরে পৃথিবীজুড়ে চলছে বিশাল বাণিজ্য। অবশ্য আমি এটাকে বেশ্যায়নও বলি। বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করছে 'ওজন কমানো ইন্ডাস্ট্রি' প্রতিবছর। এসব সৌন্দর্য ইন্ডাস্ট্রি লাখো নারীকে বুঝ দিচ্ছে যে তাদের মুখের ওপর কেমিক্যাল আবর্জনা, তোলা চিকন ভ্রু, যা কিনা আবার এঁকে ভরাট করতে হবে, এগুলোই হচ্ছে সৌন্দর্য। এর ফলে মানুষের মুক্তির যে রাজনীতি, এই জটিল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে পারত, সেই রাজনীতি যেমন অনুপস্থিত বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে, তেমনি নারীবাদী আন্দোলন আজ ইস্যুভিত্তিক অ্যাক্টিভিজমের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে পড়েছে! নারীমুক্তি আন্দোলন জাতীয় গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সঙ্গে যেমন বিযুক্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি হারিয়েছে এই লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক চরিত্র। নারীমুক্তি আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলন, যেমনটা বলেছিলেন রোজা লাঙ্ামবুর্গ, বোঝাপড়ার এই অবস্থানটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। আজকের নারীমুক্তি আন্দোলনের রাজনীতিটি জারি থাকা দরকার ত্রিমাত্রিক স্তরে: বাজার মৌলবাদের বিপক্ষে, ধর্মীয় মৌলবাদের বিপক্ষে, এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের পক্ষে। সে লড়াইটি কেবল নারীর একার নয়, গণতান্ত্রিক শিবিরের সকল নারী-পুরুষের এবং এই সত্য যত দ্রুত বোঝা যাবে ততই মঙ্গল। অনেকে আঁতলামি করে বলেন, এনজিওগুলো রুটস লেভেলে নাকি অনেক পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সচেতন হয়েছে। আরও হাবিজাবি কথাবার্তা। তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, নারীর ভাগ্যোন্নয়ন কতটা হয়েছে? আর নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা হয়েছে? প্রশ্নটা তাদের কাছে রাখলাম। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাধীনতা আজও যেন কথার কথা। অথচ এ কথা কে না জানে, অর্থনৈতিক অবয়বই নারীর স্বাধীনতাকে অনেকখানি সঞ্জীবিত করে তুলতে পারে। গতিশীল মূল্যবোধের ধারাকে বহমান রাখতে পারে। এ নিয়ে যতই আন্দোলন হোক, আইন প্রণীত হোক, রাষ্ট্র যতই সগর্বে উন্নয়নের ঘোষণা করুক, আসল ছবিটির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা স্বপ্ন, বেঁচে থাকার আয়োজন, তার রুচি অরুচি, ভালো মন্দ, বিয়ে করা না করা, বৈধ-অবৈধ- সবকিছুই আজও নিয়ন্ত্রিত। প্রজেক্টনির্ভর! কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো চোরাগোপ্তা এই নিয়ন্ত্রণ নারীকে প্রতিহত করছে। যথেচ্ছ কুযুক্তির অবতারণা করে তার নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পদদলিত করা হচ্ছে। এর হাত থেকে এই একবিংশ শতকেও এ দেশের নারীর মুক্তি নেই। নারীর স্বাধীনতা যেন অনুদানের ওপরই নির্ভরশীল। অনুদান বন্ধ হয়ে গেলে জীবনযাপন দুর্বিষহ হতে বাধ্য। তারা এমনটিই বুঝিয়ে দেন। আমি আবারও বলছি, একমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকার পরিবর্তন এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে তার স্বতন্ত্র সম্পৃক্ততাই পারে এবং পারবে এই ভুলেভরা এবং ভণিতাপূর্ণ ধারণাকে ক্রমশ পরাস্ত করতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সেটা পশ্চিমে হোক, জাপানের মতো দূরপ্রাচ্য, ভারত বা যেখানেই হোক না কেন, মেয়েদের বেরিয়ে আসাটা সম্ভবত সব সময়ই পরিস্থিতির চাপে পড়ে। অর্থনীতির প্রবল সংকটে মেয়েরা বাধ্য হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের ব্যাপারে বৃহত্তর সমাজে স্বীকৃতি না থাকলে, ন্যূনতম শর্তগুলো উপস্থিত না থাকলে তাদের বেরিয়ে আসা সম্ভব হতো না। পাশ্চাত্যের সমাজে নারীরা বহু বহু আন্দোলনের পর নিজেদের অবস্থানে অনেক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সেখানেও চতুর পুঁজি সেই স্বাধীনতাকেও অনেক সময়ই পণ্য করে বিক্রি করতে পিছপা হয় না। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন একগুঁয়ে শাসককুল নারীর সমান অধিকারকে নারীদের অযৌক্তিকাধিকার বলে বিশ্বাস করবে। যেদিন নারী দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে না। নারীর জন্য শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, আইন, বিচার যখন পুরুষের সুবিধাগুলোর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলার স্বীকৃতি পাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যেদিন নারীর ক্ষমতাকে নিজেদের শক্তির চেয়ে খাটো করে দেখবে না। নারীর শিক্ষাকে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র দেশের জন্য অপরিহার্য ভাববে। উন্নয়নে নারীর অবদানকে শ্রদ্ধা করবে। সময়কে নাড়া দেওয়ার মতো নারীরা তো সংখ্যায় যথেষ্ট। তাহলে আর দেরি কেন? গতানুগতিক মূল্যবোধগুলোকে আঘাত করে সচেতনতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। আর এ পরিবর্তন মূল্যবোধের পুনর্নির্মাণ ছাড়া সম্ভব নয়। আমাদের হাঁটতে হবে পরিবর্তনের আলোকিত এবং বর্ণালি দিনের দিকে।

  চলতি সংখ্যা  
   
  সর্বশেষ সংবাদ  
›› ডা. ইমরান এইচ সরকার এঙ্ক্লুসিভ 'মুক্তিযুদ্ধ কারও ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়' 'খালেদা জিয়ার কাছে আশাটা বেশি ছিল, যেহেতু তিনি একাত্তরের বীরাঙ্গনা' 'স্বাচিপের নেতা তো নই-ই, সদস্যও না'
›› লাগাতার হরতাল, প্রণবের ঢাকা সফর ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাহীনতা
›› বিদায় শাভেজ! মৃত্যুতেও অপরাজেয় তুমি
›› আবাসন খাতে জামায়াত নেটওয়ার
›› ৫৬ বছর পর প্রণব বাবু এলেন শ্বশুরবাড়ি ছিলেন ৩৫ মিনিট
›› নারীর উন্নয়নের নামে এনজিওর প্রজেক্টনির্ভর প্রেম
   
 
 
পুরনো সংখ্যা