Logo
প্রচ্ছদ কাহিনি
সমসময়
আলাপচারিতা
বিশ্লেষন
অনুসন্ধান
প্রতিবেদন
মিডিয়াওয়াচ
প্রবাস জীবন
অন্যভূবন
ধারাবাহিক
আত্মজীবনী
অন্যদেশ
রঙ্গের দুনিয়া
খেলা খেলা নয়
দুই পা ফেলিয়া
আয়োজন
 
  বিশ্লেষন

৫৬ বছর পর প্রণব বাবু এলেন শ্বশুরবাড়ি

ছিলেন ৩৫ মিনিট

সাজেদ রহমান

এটা কি পৃথিবীর দীর্ঘ বিলম্বিত দ্বিরাগমন? এমনটাই মানুষের কথা। কারণ, তিনি শ্বশুরবাড়ি এলেন ৫৬ বছর পর। জামাইয়ের এত বছর পর শ্বশুরবাড়ি আসার পরও কোনো আনন্দের কমতি ছিল না। পঞ্চাশ বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে তাও বেশ আগে। তাই বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে 'ওরে তোরা উলু দে,' 'বরণডালাটা কই রে ছোট বৌ?', 'শাঁখ বাজা, প্রদীপ জ্বাল!' নড়াইলের ভদ্রবিলা তো তখন কেদেকেটে একসা। মায়ের সই, দিদির সহপাঠী, কোন ছেলেবেলার এক্কাদোক্কার সঙ্গীসাথিরা হতভম্ব। পায়ে ব্যথা তার পরও সবার আগে শুভ্রা দেবী। সঙ্গে সব সময়ে আগলে রাখা দেবারতি মিত্র। একেক জন এসে জড়িয়ে ধরছেন। আর রক্ষীরা শিউরে উঠছে। 'বল দেখি আমি কে? ও...ও...মা চিনতে পারলি না। সেই যে...'। সত্যিই কাউকে চিনতে পারছেন না শুভ্রা দেবী। ওওও হাহাহা। তা তোমার মেজদি কেমন আছেন? চিনলেন শুধু কানাই বাবুকে। সম্পর্কে তার ভাই। 'কানাই না? ওই তো। হ্যাঁ আআ।' সলাজ হেসে দিদিকে প্রণাম করেন কানাই। জামাইবাবুর দিকে এগিয়ে যেতেই হইচই করে ওঠেন প্রণব বাবু। না না। ওদের কড়া বারণ। যাদের বারণ, সেই রক্ষীরা তখন ঘিরে ফেলেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব বাবুকে। এ ঘটনার পর থমকে গেল গ্রামবাসী। তাহলে প্রদীপ, মালা, বরণডালা? শুভ্রা দেবীই ভরসা। ছোটবেলার বান্ধবী কিরণ এগিয়ে এলো। কানে কানে কিছু বলতেই রাঙা হয়ে উঠল তার মুখ। বললেন, ধ্যাত। তারপর প্রণব মুখার্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, ওদের রেহাই দাও। এটা আমার বাড়ি। কেউ কিছু করবে না। রক্ষীদের সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন রাষ্ট্রপতি। এরপর তারা এগিয়ে এলেন। ছোড়া হলো খই। জামাই বরণ হলো বুকে, কপালে, হাঁটুতে বরণডালা ছুঁয়ে। তারপর শ্বশুরবাড়ি ঢুকলেন প্রণব বাবু। জীবনে প্রথম। এটা হয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নড়াইলে শ্বশুরবাড়ি এলে। তাকে আপ্যায়ন করা হয়েছিল নতুন জামাইয়ের মতো। বরণ ডালা, উলুধ্বনি, আর পৌঢ় শ্যালক-শ্যালিকাদের উচ্ছ্তাস তো ছিলই। এমনকি জামাইয়ের জন্য ছিল সোনার চেইন। দিদির জন্য ছিল বাংলাদেশের জামদানি শাড়ি। বাড়িতে প্রবেশ করেই প্রণব মুখার্জি পূজা মন্দিরে প্রবেশ করেন। শ্বশুরবাড়িতে রয়েছে রাধাগোবিন্দ মন্দির। সস্ত্রীক ঢুকে পড়লেন মন্দিরে। একই সঙ্গে বসে পড়লেন রাধামাধবের পূজায়। পূজা প্রণব বাবুর অভ্যাস। বিগত ৫০ বছর ধরে প্রতিদিন সাতসকালে উঠে এক ঘণ্টা চন্ডীপাঠ আর পুজো তার রুটিনের অঙ্গ। নড়াইল সদরের ভদ্রবিলা ইউনিয়নের ভদ্রবিলা গ্রামের শ্বশুরবাড়ির ১২ জন এবং সদর উপজেলার তুলারামপুর গ্রামের মামা শ্বশুরবাড়ির ৬ জনসহ মোট ১৮ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ৩৫ মিনিট একান্ত্মভাবে সময় কাটান এবং সবার খোঁজখবর নেন। শ্বশুরবাড়িতে বিভিন্ন প্রকার ফল দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হলেও শুধু ডাবের পানি ও দেশি কুল বরই খেয়েছেন প্রণব বাবু। প্রণব বাবু শ্বশুরবাড়ির লোকদের জন্য আনেন বিভিন্ন ধরনের উপহারসামগ্রীর ৬টি বাঙ্। এগুলোর মধ্যে ছিল শাড়ি, ধুতি ও শিশুদের জন্য খেলনা। নড়াইল কন্যা শুভ্রা মুখার্জির ছোট ভাই কানাইলাল ঘোষ জানান, দাদাবাবু আর শুভ্রা দিদিকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত্ম গর্বিত। এ রকম আনন্দ আগে কখনোই পাইনি। দাদাবাবুর কাছে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় একটি মেডিকেল কলেজ, বাড়ির পাশে কালীবাড়ি ঘাট ও শ্মশান নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস জানান, দাদাবাবুর (রাষ্ট্রপতি) কাছে নড়াইলবাসীর পক্ষ থেকে একটি মানপত্র দেওয়া হয়েছে। মানপত্রে নড়াইলের উন্নয়নের জন্য একটি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ভিসা সহজীকরণসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি এই দাবিগুলোর একটি কপি হাতে করে নেন। শেষ খবর হলো, ভদ্রবিলা গ্রামের স্কুলটির ভবন সরকার করে দেবে। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে শোনা গেছে। প্রণব বাবু শ্বশুরবাড়ি ছিলেন ৩৫ মিনিট। এরপর তিনি চলে যান। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শুভ্রা দেবী। নড়াইল সদরের ভদ্রবিলা গ্রামে চিত্রা পাড়ের ছোটখাটো জমিদার অমরেন্দ্র ঘোষের মেয়ে শুভ্রা ঘোষ। তারা ৪ ভাই, ৪ বোন। এ বাড়িতেই জন্মেছিলেন ১৯৪৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। মা মিরা রানী ঘোষ। শুভ্রা মুখার্জির ডাক নাম গীতা। ১৯৫৫ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। সেই তার শেষ যাওয়া। বর্তমানে অভিজিৎ মুখার্জি ও সুরজিৎ মুখার্জি নামে দুই ছেলে এবং শর্মিষ্ঠা মুখার্জি নামে এক মেয়ে রয়েছে তাদের। শুভ্রার ভাইবোনেরা কালক্রমে ভারতে চলে গেলেও অমরেন্দ্র ঘোষের অপর সন্ত্মান শুভ্রার ছোট ভাই কানাইলাল ঘোষ পৈতৃক ভিটায় প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন। তিনি ৩ পুত্র, ১ কন্যার জনক। শুভ্রা মুখার্জি এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। তার পরও তিনি মনে রেখেছেন তার গ্রাম নড়াইলের ভদ্রবিলা গ্রামকে। সর্বশেষ গ্রামে এসেছিলেন ১৯৯৫ সালে। নড়াইল শহর থেকে সোজা দক্ষিণে ১০ কিলোমিটার দূরে নিভৃত ভদ্রবিলা। চিত্রা নদীর ধারে ছবির মতো সাজানো-গোছানো গ্রামে পা রেখে সে বছর শুভ্রা মুখার্জি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার পিতার কাছারি বাড়িতে এখন তহশিল অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও একটি পোস্ট অফিস। বাড়িসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। বাড়ি এলে শুভা মুখার্জিকে এলাকার অগণিত নারী-পুরুষ সে সময় স্বাগত জানান। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে তাকে বরণ করা হয়েছিল। শৈশবের স্মৃতিঘেরা নদীর তীর, প্রাচীন বৃক্ষ- এগুলো গভীর আপন মমতা দিয়ে স্পর্শ করেন তিনি। শুভ্রা মুখার্জি শৈশবে কিছুদিন ছিলেন মামা বাড়ি নড়াইল সদরের তুলারামপুর গ্রামে। তার মামা নিশিকান্ত্ম ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। মামাতো দাদারা এখনো ওই গাঁয়ে থাকেন। তুলারামপুর কাজলা নদীর তীর ঘেঁষে একটি সমৃদ্ধ জনপদ। পাশেই চাঁচড়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেছেন। কিছুদিন পড়েছেন তুলারামপুর বালিকা বিদ্যালয়ে। সে সময় ওই বিদ্যালয় তাকে স্বাগত জানায়। বিদ্যালয়টি শুভ্রা মুখার্জির মায়ের জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়ে এসে সে সময় তিনি ১০ হাজার টাকার অনুদান দেন। ১৯৫৫ সালে শুভ্রা মুখার্জি ভারতে চলে যান। ৪০ বছর পর ১৯৯৫ সালে তিনি নড়াইলে এসে স্কুলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন তাকে একনজর দেখার জন্য। নড়াইলের কার্তিক ঘোষ শুভ্রা মুখার্জির সম্পর্কে পিসিতো বোন। কার্তিক ঘোষ জানান, এখনো আমাদের সঙ্গে শুভ্রা মুখার্জির নিয়মিত যোগাযোগ হয়। শুভ্রা মুখার্জি তার ছোটবেলার কথা ভুলতে পারেন না। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে যখন বিয়ে হয় তখন শুভ্রা মুখার্জির বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর, সেটা ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই। আর ২২ বছরের যুবক প্রণব মুখার্জি। প্রণব বাবুর বাড়ি ভারতের বীরভুমের মীরাটি বা কীর্ণহার। তার পিতা ছিলেন প্রখ্যাত গান্ধীবাদী নেতা কামদা কিংকর মুখার্জি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন প্রণব বাবু একটি মর্নিং স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৬৯ সালের ৪ জুলাই প্রণব মুখার্জি বাংলা কংগ্রেসের পক্ষে রাজ্যসভার সদস্য হন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন ১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। একজন দক্ষ প্রশাসক এবং অর্থনীতিবিদ হিসেবে প্রণব মুখার্জি ইন্দিরা গান্ধীর আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। ১৯৮৪ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পর তিনি ইন্দিরা মন্ত্রিসভার দুই নম্বর ব্যক্তি হিসেবে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠেন। নরসীমা রাওয়ের আমলে একজন মন্ত্রীর মর্যাদায় ভারতের যোজনা কমিশনের (পরিকল্পনা কমিশন) ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ১৯৯৩ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হন। বর্তমান কংগ্রেসের সরকার তাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর সর্বশেষ গত বছর তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হন। প্রণব মুখার্জির এই রাজনৈতিক উত্তরণের পেছনে শুভ্রা মুখার্জির অবদানও কম নয়। বিভিন্ন সময় সুচিন্ত্মিত মতামত দিয়ে তিনি স্বামীকে সাহায্য করেছেন। তবে শুভ্রা মুখার্জি স্বামীর প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কখনো নিজের বা পারিবারিক স্বার্থে ব্যবহার করেননি। তিনি আদতে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গীতাঞ্জলির প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে তিনি বহু দেশে ঘুরেছেন এবং এর মাধ্যমেই সাধ্যমতো তিনি তুলে ধরেছেন জন্মভূমির কথা। শুভ্রা মুখার্জি পরিচালিত ও হিন্দিতে রূপান্ত্মরিত 'চন্ডালিকা' ভারতের হিন্দি বলয়ে জনপ্রিয়। গল্প, প্রবন্ধ ও নানা বিষয়ের ওপর অসংখ্য ফিচারও তিনি লিখেছেন। পুত্র অভিজিৎ মুখার্জি এবং কন্যা তার কাজের বিভিন্ন সময় সাহায্য করেছেন। অভিজিৎ মুখার্জি বর্তমানে ভারতের এমএলএ। রাজনৈতিক জীবন শুভ্রা মুখার্জির ততটা পছন্দের নয়, কিন্তু স্বামী যেহেতু ব্যস্ত্ম রাজনৈতিক, ভারতের মতো বড় একটি দেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন, সে জন্য স্ত্রী হিসেবে তাকেও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। অবশ্য এখন থেকে নয়, প্রণব বাবু যেদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পান, সেদিন থেকেই দিল্লির রাজনৈতিক জগতের রহস্যময় আঙিনায় পা রাখতে হয় তাকেও। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শুভ্রা মুখার্জির গভীর সখ্য ছিল। বাংলাদেশের রান্না পছন্দ করতেন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী। শুভ্রা মুখার্জি নিজ হাতে বাংলাদেশের রান্না করে ইন্দিরা গান্ধীকে আপ্যায়িত করতেন প্রায়ই।

  চলতি সংখ্যা  
   
  সর্বশেষ সংবাদ  
›› ডা. ইমরান এইচ সরকার এঙ্ক্লুসিভ 'মুক্তিযুদ্ধ কারও ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়' 'খালেদা জিয়ার কাছে আশাটা বেশি ছিল, যেহেতু তিনি একাত্তরের বীরাঙ্গনা' 'স্বাচিপের নেতা তো নই-ই, সদস্যও না'
›› লাগাতার হরতাল, প্রণবের ঢাকা সফর ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাহীনতা
›› বিদায় শাভেজ! মৃত্যুতেও অপরাজেয় তুমি
›› আবাসন খাতে জামায়াত নেটওয়ার
›› ৫৬ বছর পর প্রণব বাবু এলেন শ্বশুরবাড়ি ছিলেন ৩৫ মিনিট
›› নারীর উন্নয়নের নামে এনজিওর প্রজেক্টনির্ভর প্রেম
   
 
 
পুরনো সংখ্যা